মূল্যস্ফীতির চাপ ও আয়বৈষম্য

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের ফুড ব্যাংক নির্ভরতা বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি অনুদানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় বেশকিছু ফুড ব্যাংক।

যুক্তরাষ্ট্রে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি অনুদানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় বেশকিছু ফুড ব্যাংক। নানা উৎস থেকে পাওয়া সহায়তার ভিত্তিতে অলাভজনক বিভিন্ন সংস্থা এসব খাদ্য বিতরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে দাতব্য ও করপোরেট সংস্থার পাশাপাশি দেশটির সরকারও ভূমিকা রাখে। এতদিন এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রমে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ছিল অনেক কম। তবে বর্তমানে সে চিত্র বদলে যাচ্ছে। ফুড ব্যাংকগুলোয় এখন খাদ্যসহায়তা নিতে আসছে প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ। বিপুল পরিমাণ মানুষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে ফুড ব্যাংকগুলোর কর্মীদের। বিশেষ করে চলতি থ্যাংকস গিভিং মৌসুমকে সামনে রেখে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাদের। কারণ এবার ফুড ব্যাংকে সহায়তা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ছিল তাদের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। খবর সিএনএন।

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটিতে এমন পরিস্থিতির জন্য ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, ওয়াল স্ট্রিটের উল্লম্ফনে মার্কিন নাগরিকদের একটি অংশ আরো সম্পদশালী হচ্ছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট কাজের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এ নির্দিষ্ট কাজের ওপর নির্ভরশীলদের একাংশ ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তুলছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম দেখালেও আয়তন, বৈচিত্র্য, আয় প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা ও সম্পদের বণ্টন বৈষম্যের কারণে সেটুকুই সাধারণ মার্কিন জনগণের নাভিশ্বাস তুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

নভেম্বরের শুরুতে থ্যাংকস গিভিং মেনুর অন্যতম আকর্ষণ টার্কি ও অন্যান্য খাবার বিতরণ শুরু করে আইওয়ার পোল্ক কাউন্টিতে অবস্থিত আরবানডেল ফুড প্যান্ট্রি। ফুড ব্যাংকটিতে এবার সহায়তা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ছিল তাদের হিসাবের চেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত এখানে সাহায্য নিতে এসেছে দুই হাজারের বেশি পরিবার। এতে সংস্থাটির বিতরণের জন্য শুরুতে বরাদ্দকৃত খাবারও বেশ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত সহায়তা নিতে আসা মার্কিনদের হতাশ হতে হয়নি। দাতাদের কাছ থেকে দ্রুত অতিরিক্ত তহবিল ও অনুদান সংগ্রহ করতে সমর্থ হওয়ায় থ্যাংকস গিভিংয়ের কার্যক্রম বেশ ভালোভাবেই শেষ করেছে আরবানডেল।

আরবানডেল ফুড প্যান্ট্রির সিইও এবং একমাত্র পূর্ণকালীন কর্মী প্যাটি স্নেডন-কিস্টিং বলেন, ‘নভেম্বরের মতো পরিস্থিতি আমরা আগে কখনো দেখিনি।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরবানডেলের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ফুড ব্যাংক ও সংগঠনকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেশটির সাধারণ নাগরিকদের গৃহস্থালি বাজেটকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। একই সঙ্গে ৪৩ দিনের রেকর্ড ফেডারেল শাটডাউনের সময় সরকারি সহায়তা কর্মসূচি সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (এসএনএপি) বন্ধ থাকার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি অনেক মার্কিন পরিবার। এ কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগী পরিবারগুলোকে ব্যাংক বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ সহায়তা দেয়া হয়, যা তারা গ্রোসারি বা সুপারমার্কেটে খাবার কিনতে ব্যবহার করতে পারে।

চলতি থ্যাংকস গিভিং মৌসুমে খাদ্যের উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিকের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়েছে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশটিতে গ্রোসারি পণ্যের গড় দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং চলতি বছরের এখন পর্যন্ত গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িেয়ছে ১ দশমিক ৭ শতাংশে।

চলতি বছরে দাম বাড়ার হার তুলনামূলক কম হলেও এর চাপ তুলনামূলক বেশি। এর পেছনে বড় একটি কারণ গত কয়েক বছরে দেশটিতে খাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। কভিড-মহামারীর পর একসময় দেশটিতে বার্ষিক পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল, যা ছিল কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সে সময়কার চাপ এখনো সামলে উঠতে পারেনি অনেক পরিবার। তাদের জন্য এখনো দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ ছাড়াও শাটডাউন চলাকালে এসএনএপি কর্মসূচি পুরোপুরি স্থগিত হওয়ায় অনেক পরিবারে সংকট বেড়ে যায়। ওই সময় গুগলে ‘ফুড ব্যাংকস নিয়ার মি’ লিখে অনুসন্ধানও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ধনীদের আয় বৃদ্ধির হার সাধারণ শ্রমিকদের মজুরি প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি। দেশটিতে শেয়ারবাজার ও বাড়ির দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও ২০২৩ সালের পর এসএনএপি সুবিধা গ্রহণকারী পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে।

লস অ্যাঞ্জেলেস রিজিওনাল ফুড ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মাইকেল ফ্লাড বলেন, ‘মাসিক আয় অনুযায়ী খাবারের দাম না বাড়লে গৃহস্থালি বাজেটে প্রচণ্ড চাপ পড়ে।’

তিনি আরো জানান, থ্যাংকস গিভিংয়ের মৌসুমে চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে ফুড ব্যাংক কার্যক্রম। তবে বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় তারা বিতরণ কেন্দ্র বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এবার মোট খাদ্য বিতরণ ২৪ শতাংশ বেড়েছে।

গত এক মাসে ফিলাডেলফিয়ার শেয়ার ফুড প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত ফুড ব্যাংকগুলোয় নতুন নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ১২ গুণ বেড়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জর্জ ম্যাটিসিক। তিনি আরো বলেন, ‘রাজ্যের জরুরি তহবিল ও কমিউনিটি ফান্ড থেকে অনুদান তাদের খাদ্য কেনা অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে।’

জর্জ ম্যাটিসিক বলেন, ‘গত কয়েক মাস ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময়।’

ছুটির মৌসুমে ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদাসহ বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মার্কিন ফুড ব্যাংকগুলোকে। তবে একটি ভালো দিক হলো স্বেচ্ছাসেবীদের সংখ্যা প্রচুর এবং তারা আগের তুলনায় বেশি সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছেন। খাবার বিতরণ, প্যাকিং ও পৌঁছে দিতে স্বেচ্ছাসেবীরা বেশি সময় ও শ্রম দিচ্ছেন। ফুড ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবীদের উপস্থিতি তাদের জন্য বড় সহায়তা ও ছুটির মরশুমে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে অনেক সাহায্য করছে।

ছয় বছর ধরে এলএ রিজিওনাল ফুড ব্যাংকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন মেরি কনর্স। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত প্রচুর স্বেচ্ছাসেবী পাই। সমাজে কিছু দিতে পেরে তারা সবাই খুবই আনন্দিত।’

আরও